নারায়ণগঞ্জ জেলার বনেদী সাব-রেজিস্ট্রি অফিস হিসেবে পরিচিত রূপগঞ্জ পূর্ব সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ, দুর্নীতি ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে দলিল বাণিজ্য চলার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন কথিতভাবে ক্ষমতাধর সহকারী সাব-রেজিস্ট্রার আমিনুল ইসলাম।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, অফিসটিতে আমিনুল ইসলামের কথাই শেষ কথা। তাঁর ইশারা ছাড়া কোনো দলিলেই স্বাক্ষর করেন না সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রার। নিয়ম অনুযায়ী একটি দলিল সম্পন্ন করতে ৯ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ না দিলে দলিলটি সাব-রেজিস্ট্রারের সামনে উপস্থাপনই করা হয় না।
স্থানীয়দের দাবি, গোপন সমঝোতার মাধ্যমে জমির শ্রেণি পরিবর্তন, সরকারি খাস খতিয়ান ও এনিমি প্রোপার্টিকে ব্যক্তি মালিকানায় রূপান্তর করে বিভিন্ন ডেভেলপার কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। এতে সরকার প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আমিনুল ইসলাম ভলিউম লোপাট, দলিল টেম্পারিং, ভুয়া এনআইডি কার্ডের অপব্যবহারসহ নানা ধরনের অনিয়মে জড়িত। তার নির্ধারিত অর্থ প্রদান করলে গুরুতর ত্রুটি ও আইনি জটিলতা থাকা জমিও দ্রুত রেজিস্ট্রেশন হয়ে যায়। আর দরদাম না মিললে জমিদাতা ও গ্রহীতাদের মাসের পর মাস অফিসে ঘুরতে হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দলিল বা পর্চায় সামান্য ভুল কিংবা এনআইডিতে নামের বানান ভুল থাকলেই আমিনুল ইসলাম ভয়ভীতি দেখিয়ে বলেন—
“এসব জমি কস্মিনকালেও রেজিস্ট্রি সম্ভব নয়।”
এরপর কৃত্রিম আতঙ্ক সৃষ্টি করে শতকপ্রতি এক থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
একাধিক অভিযোগে বলা হয়েছে, ফ্রেশ ভিটা ও নাল জমিকে ডোবা-নালা বা পতিত দেখিয়ে শ্রেণি পরিবর্তনের নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এমনকি মামলা চলমান থাকা জমিও গোপন চুক্তির মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী বলেন,
“এনআইডিতে নামের সামান্য ভুল দেখিয়ে সরকারি ফি ছাড়াও আমার কাছ থেকে এক লাখ টাকা ঘুষ নেওয়া হয়েছে।”
সূত্র জানায়, জমি রেজিস্ট্রেশনের আগে সেরেস্তা খরচ, ‘বড় স্যারের’ নাম ভাঙিয়ে ডিআর অফিসের জন্য দলিলপ্রতি এক হাজার টাকা, নাস্তা খরচ এবং দলিলমূল্যের অতিরিক্ত ১০ শতাংশ অর্থ প্রদান করলে আমিনুল ইসলাম বিশেষ সাংকেতিক চিহ্ন দিয়ে দলিল চিহ্নিত করেন। ওই চিহ্ন দেখেই সাব-রেজিস্ট্রার বুঝে নেন যে কাঙ্ক্ষিত অর্থ পৌঁছে গেছে। এরপর কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই দলিলে স্বাক্ষর করা হয়।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে অফিসের মোহরার, এক্সট্রা মোহরার, উমেদার, কয়েকজন দলিল লেখক সমিতির নেতা এবং স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিকে নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের বাইরে গিয়ে কোনো দলিল রেজিস্ট্রেশন কার্যত অসম্ভব বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্রের দাবি, প্রতিদিন AP ও VP রেজিস্ট্রেশন এবং জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে আদায়কৃত অর্থের ৫০ শতাংশ সাব-রেজিস্ট্রার, ৩০ শতাংশ আমিনুল ইসলাম এবং বাকি ২০ শতাংশ অফিস স্টাফ, দলিল লেখক সমিতি, ডিআর অফিস ব্যবস্থাপনা ও সিন্ডিকেটভুক্তদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।
সচেতন মহলের মতে, সন্ধ্যার পর অফিস শেষে বাড়ি ফেরার আগমুহূর্তে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এনফোর্সমেন্ট টিম আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করলে ঘুষের টাকাসহ সংশ্লিষ্টদের হাতেনাতে আটক করা সম্ভব।