বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর বরিশাল কার্যালয়ের পরিদর্শক সৌরভ কুমার সাহার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দায়েরের পরও মাঠপর্যায়ে তার প্রভাব ও কার্যক্রমে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন নেই—এমন অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
অভিযোগকারীদের দাবি, মামলার পর কিছুদিন নীরব থাকলেও এখন আবার আগের মতোই চলছে লাইসেন্স, ফিটনেস ও রেজিস্ট্রেশন বাণিজ্য।
গত জানুয়ারিতে ১৯১টি সিএনজি অটোরিকশার অনিয়মিত রেজিস্ট্রেশন ইস্যুতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একটি মামলা দায়ের করে। ওই মামলায় প্রধান আসামি করা হয় সৌরভ কুমার সাহাকে। পরে তিনি জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় দায়িত্বে সক্রিয় হন।
এখন প্রশ্ন উঠেছে—মামলার তদন্ত কতদূর এগিয়েছে? অভিযোগে উল্লিখিত আর্থিক লেনদেন কি অনুসন্ধান করা হয়েছে? সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের তথ্য কি খতিয়ে দেখা হয়েছে?
লাইসেন্স বোর্ডে আগের চিত্র?
সাম্প্রতিক কয়েকটি লাইসেন্স বোর্ডে অংশ নেওয়া পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ, পাসের হার অস্বাভাবিকভাবে কম রাখা হচ্ছে। বোর্ড শেষে নির্দিষ্ট দালালচক্র ফেল করা প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে বলে দাবি রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতি লাইসেন্সে প্রায় আড়াই হাজার টাকা কমিশনের কাঠামো আগের মতোই বহাল আছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিবহন ব্যবসায়ী বলেন, “মামলার পর কয়েক সপ্তাহ চুপচাপ ছিল। এখন আবার আগের মতোই চলছে। শুধু লেনদেনের ধরনটা কিছুটা গোপন করা হয়েছে।”
সম্পদের অনুসন্ধান কোথায়?
অভিযোগ রয়েছে, মাত্র ১১ বছরের চাকরি জীবনে অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন সৌরভ কুমার সাহা। বাস, প্রাইভেট কার, সিএনজি অটোরিকশা ও পরিবহন ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে তার বিনিয়োগ রয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। যদিও তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এ বিষয়ে কয়েকটি প্রশ্ন ঘুরছে—
তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা যানবাহনের প্রকৃত মালিকানা
কি যাচাই করা হয়েছে?
আয়কর নথি ও সম্পদ বিবরণীর সঙ্গে বাস্তব সম্পদের মিল আছে কি?
পরিবহন ব্যবসায় বিনিয়োগের উৎস কী?
একটি সূত্র জানায়, আত্মীয়স্বজনের নামে নিবন্ধিত সম্পদ ও ব্যবসার আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
প্রশাসনিক নীরবতা-
বিআরটিএর অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, অভিযোগ ও মামলার পরও দৃশ্যমান কোনো বিভাগীয় তদন্ত এগোয়নি। শোকজ, সাময়িক বরখাস্ত বা বদলির মতো কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপও চোখে পড়েনি।
সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতির অভিযোগে মামলা হওয়া কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় তদন্ত না হলে ভুল বার্তা যায়। এতে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কি প্রশাসনিক ছত্রছায়া পাচ্ছেন?
জননিরাপত্তার প্রশ্ন-
লাইসেন্স ও ফিটনেস প্রক্রিয়ায় অনিয়ম কেবল আর্থিক দুর্নীতির বিষয় নয়, এটি সরাসরি সড়ক নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। অযোগ্য চালক বা ফিটনেসবিহীন যানবাহন রাস্তায় নামলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। ফলে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের প্রশ্ন নয়, এটি জনস্বার্থেরও বিষয়।
এখন দেখার বিষয়, চলমান মামলার তদন্ত কতদূর এগোয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাস্তবিক কোনো পদক্ষেপ নেয় কি না। নাকি অভিযোগ, মামলা ও আলোচনা শেষে সবকিছু আবার সময়ের স্রোতে মিলিয়ে যাবে—সেই প্রশ্নই ঘুরছে জনমনে।