দেশে দুর্নীতির আলোচনায় বারবার উঠে আসে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর নাম। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এই সংস্থায় দুর্নীতি যেন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়।
সেই দুর্নীতির অন্যতম প্রভাবশালী চরিত্র হিসেবে উঠে এসেছে বিআরটিএ সদর দপ্তরের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পরিচালক প্রকৌশলী মো. শহীদুল্লাহর নাম।
তার বিরুদ্ধে অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর বাবর রোডের শেলটেক চন্দ্রমল্লিকায় একটি আলিশান ডুপ্লেক্স অ্যাপার্টমেন্ট, শ্যামলীর ২ নম্বর রোডে মার্বেল পাথর খচিত বিলাসবহুল বহুতল ভবন, গাজীপুরের জয়দেবপুর ও চন্দনায় দুটি বাড়ি এবং নরসিংদীর রায়পুরায় নামে-বেনামে একাধিক সম্পদের তথ্য উঠে এসেছে অভিযোগে।
বিআরটিএ সূত্র জানায়, শহীদুল্লাহ নিয়মিত দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিলাসবহুল ভ্রমণ করতেন। সরকারি কর্মকর্তা হয়েও এমন ব্যয়বহুল জীবনযাপন নিয়ে সংস্থার ভেতরেই দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন উঠছিল।
সিএনজি রিপ্লেস প্রকল্পে শত কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে শহীদুল্লাহ সিএনজি অটোরিকশা রিপ্লেস প্রকল্পকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ ঘুষ বাণিজ্যে জড়ান।
অভিযোগে বলা হয়, চট্টগ্রামে ১৩ হাজার সিএনজি প্রতিস্থাপনের সময় প্রতিটি গাড়ির বিপরীতে ২ লাখ টাকা এবং রেজিস্ট্রেশনের জন্য অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। এতে শুধু এই প্রকল্প থেকেই আদায় হয় প্রায় ২৮৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
এছাড়া ভারতের তৈরি ২ হাজার চার আসনের ম্যাগজিমা অটোরিকশাকে বেআইনিভাবে সাত আসনের অটো-টেম্পু হিসেবে রেজিস্ট্রেশন দিয়ে গাড়িপ্রতি ২ লাখ টাকা করে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ঘুষ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে চট্টগ্রামের প্রায় ২০ হাজার ‘গ্রামবাংলা’ সিএনজি থেকে গাড়িপ্রতি ৩০ হাজার টাকা করে আরও প্রায় ৬০ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে শহীদুল্লাহ ও তার ঘনিষ্ঠ সিন্ডিকেট প্রায় ৩৮৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঘুষ বাণিজ্যে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
দালাল সিন্ডিকেট ও নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য
ঢাকায় বদলির পরও দুর্নীতির ধারা থামেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। বিআরটিএ ঢাকা মেট্রো সার্কেল ১, ২, ৩ ও ৪-এ ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রত্যেক পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে ২ হাজার টাকা করে আদায় করা হতো। অভিযোগ অনুযায়ী, মাসে প্রায় ১৮ হাজার পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হওয়ায় মাসিক আদায় দাঁড়াত প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। তিন বছরে এই অঙ্ক প্রায় ১২৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
বিআরটিএ সূত্রের দাবি, এই অর্থের একটি অংশ সরাসরি যেত সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নির্বাচনী তহবিলে।
রাজনৈতিক যোগসূত্র ও আন্দোলন দমনের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, জুলাই মাসের ছাত্র আন্দোলন দমন করতে সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের পিএস এবং বিআরটিএর সাবেক চেয়ারম্যান গৌতম চন্দ্র পালের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন শহীদুল্লাহ। আন্দোলন ভিন্নখাতে নিতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
এছাড়া, শহীদুল্লাহকে ঘিরে একটি শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে, যার মাধ্যমে বিআরটিএতে দালাল ছাড়া কোনো কাজ হতো না বলে অভিযোগ রয়েছে।
তদন্ত ও বর্তমান অবস্থান
নানা অভিযোগের পর ২০২৫ সালের ২৩ জুন তাকে ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক পদ থেকে সরিয়ে বিআরটিএ সদর দপ্তরের ইঞ্জিনিয়ারিং উইংয়ের পরিচালক করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, নতুন দায়িত্বেও তিনি তার প্রভাব ও অদৃশ্য ক্ষমতার বলয় অক্ষুণ্ণ রেখেছেন।
সম্প্রতি শহীদুল্লাহসহ উপ-পরিচালক ছানাউল হক, মোরছালিন ও রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে জানতে বিআরটিএ সদর দপ্তরের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।