সরকারি কর্মচারীদের আলীশান ভবন ও অভিজাত ফ্ল্যাটে ভরে গিয়ে ময়মনসিংহ নগরী যেন আরেক ‘বেগমপাড়া’তে পরিণত হয়েছে। বিভাগের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কেরানি, ক্যাশিয়ার, হাসপাতালের উচ্চমান সহকারী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, পুলিশের সাবেক ওসি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা, সরকারি কলেজের শিক্ষক, ভূমি কর্মকর্তা, সার্ভেয়ার এমনকি তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির এমএলএসএস ও পিওনরাও গড়ে তুলেছেন ৮ থেকে ১৬ তলা পর্যন্ত বিশাল বহুতল ভবন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একাধিক কর্মচারী যৌথ মালিকানায় নির্মাণ করেছেন দৃষ্টিনন্দন অ্যাপার্টমেন্ট। ময়মনসিংহ নগরীর গোলকিবাড়ি, আকুয়া মড়লপাড়া (হাজীবাড়ি), আমলাপাড়া, মাসকান্দাসহ অন্তত ৪৯টি স্থানে ইতোমধ্যে এসব আলীশান ভবন গড়ে উঠেছে। নির্মাণাধীন রয়েছে আরও শতাধিক ভবন।
দুদকের অনুসন্ধান শুরু
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর জনস্বার্থে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ জমা দেন আবুল খায়ের নামে এক ব্যক্তি। অভিযোগের ভিত্তিতে বর্তমানে অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আলীশান ভবনের পাশাপাশি বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় সাড়ে পাঁচশ একর জমিও কিনেছেন সংশ্লিষ্টরা। অধিকাংশ সম্পত্তির মালিকানা রাখা হয়েছে স্ত্রী বা পরিবারের সদস্যদের নামে। কেউ কেউ কানাডা, দুবাই ও ভারতে বাড়ি নির্মাণ করেছেন বলেও তথ্য মিলেছে। কর্মচারীদের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে—ময়মনসিংহে গড়ে উঠেছে ‘আরেক বেগমপাড়া’।
তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ১৪৩ জন কর্মচারীর মধ্যে অন্তত ৬৭ জন অল্প সময়ে কোটিপতিতে পরিণত হয়েছেন। অনুসন্ধান বলছে, কারও কারও সম্পদের পরিমাণ শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন, নেই কার্যকর ব্যবস্থা
ময়মনসিংহ বিভাগীয় শহর ও জেলা সদরে বছরের পর বছর কর্মরত এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর একটি বড় অংশ আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী ও প্রভাবশালী নেতাদের সুপারিশে দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে বহাল ছিলেন। অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তদন্ত সীমাবদ্ধ ছিল কাগজে-কলমে। হাতে গোনা কয়েকজনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা হলেও প্রভাবশালীরা রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
আলোচিত ভবন ও ‘কোটিপতি’ তালিকা
ময়মনসিংহ নগরীর গোলকিবাড়ি এলাকায় নির্মিত ১১ তলা ‘স্বপ্ন টাওয়ার’, আকুয়া হাজীবাড়ি মোড়ে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং টাওয়ার’, ‘ইব্রাহিম টাওয়ার’ ও ‘ইউলিটি টাওয়ার’ নির্মাণ করে আলোচনায় এসেছেন শিক্ষক ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
কোটিপতি হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ক্যাশিয়ার মো. এনামুল হক, ভূমি কর্মকর্তা আব্দুল গনি, যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা শাহীন আলম, পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামসহ অন্তত ৩০ জন।
এছাড়া যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা ফারজানা পারভিন, নুরুজ্জামান চৌধুরী, জোয়াহের আলী মিয়া, নদ্দন কুমার দেবনাথ, নূর মোহাম্মদ, গোলাম মোস্তফাসহ প্রায় ৬৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী অবৈধ অর্থে আলীশান বাড়ি নির্মাণ করে নগরীতে বসবাস করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
শতকোটি টাকার অভিযোগ
ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, জালিয়াতি ও স্টাফ কোয়ার্টার বরাদ্দে শতকোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দু’টি তদন্ত চলমান রয়েছে।
দুদক সূত্র জানায়, ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের সাবেক জেলার ও বর্তমানে নেত্রকোনা জেলা সুপার (চলতি দায়িত্ব) আব্দুল্লাহ ইবনে তোফাজ্জল হোসেন খানের নামে রয়েছে চারটি বাড়ি। তিনি জামতলা মোড়ে ৬ শতাংশ জমির ওপর ৭ তলা ভবন নির্মাণ করছেন। নগরীর বিভিন্ন স্থানে পাঁচটি জমি কিনেছেন, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৮ কোটি টাকা।
ক্যাশিয়ার এনামুল হকের যৌথ ভবন
দুদকের অনুসন্ধানে জানা যায়, ক্যাশিয়ার মো. এনামুল হক ও তার ঘনিষ্ঠ ১৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী যৌথভাবে গোলকিবাড়ি এলাকায় ১১ তলা বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ করেছেন। এতে ব্যয় হয়েছে আনুমানিক ২৪ কোটি টাকা। এনামুল হক দাবি করেন, ২০১১ সালে ৬ শতাংশ জমি কিনে ধাপে ধাপে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।
উচ্চমান সহকারী সাদেকুল ইসলামের সম্পদের পাহাড়
উচ্চমান সহকারী সাদেকুল ইসলামের সম্পত্তির বিবরণে অনুসন্ধানী টিম বিস্মিত হয়। তিনি ময়মনসিংহের আমলাপাড়া ও গোলকিবাড়িতে প্রায় ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি ১১ তলা ভবন নির্মাণ করেছেন। পাশাপাশি ৪৫ শতাংশ জমি কিনেছেন, যার দলিল নম্বর ১২০, ২৩০৭, ৫৬৯, ৭০৪, ৭০০ ও ৫৪৫।
তার দ্বিতীয় স্ত্রীর নামে রাজধানীর উত্তরা সেক্টর-১০ এ ৯ তলা বাড়ি রয়েছে। এছাড়া উত্তরা ও ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকায় আরও সাতটি ফ্ল্যাটের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রথম স্ত্রী সোনিয়া আক্তার অভিযোগ করেন, অবৈধ অর্থের প্রতিবাদ করায় তাকে উপেক্ষা করে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন সাদেকুল ইসলাম।
আইনি পদক্ষেপের দাবি
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. আজীম বিল্লাহ জয়নাল বলেন, এতদিন কানাডা বা লন্ডনের বেগমপাড়ার কথা শোনা গেলেও এখন ময়মনসিংহেও সেই চিত্র দেখা যাচ্ছে। যাদের জানার দায়িত্ব, তারা না জানলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
তিনি জানান, জনস্বার্থে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন দাখিল করা হয়েছে।