চার-পাঁচ বছর আগেও ছিলেন গ্রাম্য পশু চিকিৎসক। যাতায়াতের ভাড়ার টাকাও ছিল না। অথচ এখন শত কোটি টাকার মালিক।
এমনই বিস্ময়কর উত্থানের অভিযোগ উঠেছে মাদারীপুরের শীর্ষ দালাল কেএম নাসির কাজীকে ঘিরে, যিনি পদ্মা সেতু প্রকল্পসহ বিভিন্ন ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমে ভয়াবহ দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ।
মাদারীপুর জেলা প্রশাসনের তৈরি দালাল তালিকায় নাসির কাজী শীর্ষে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের অর্থ আত্মসাৎ করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র শত শত কোটি টাকা লোপাট করেছে।
সহযোগীদের জবানবন্দিতে বেরিয়ে আসে ভয়াবহ তথ্য
কারাবন্দি সহযোগী ও ভুক্তভোগীদের তথ্য অনুযায়ী, নাসির কাজীর নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট ভুয়া মালিক সাজিয়ে বিল উত্তোলন করত। বিনিময়ে দরিদ্র মানুষদের সামান্য অর্থ দিয়ে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হতো।
দত্তপাড়া ইউনিয়নের ইউপি সদস্য সুধাংশ মন্ডল জানান, মাত্র দুই লাখ টাকা ভাগ পাওয়ার আশায় তিনি স্বাক্ষর দিয়ে ফেঁসে যান।
একই অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন শাহীন বেপারি নামের এক দালাল।
আরেক ভুক্তভোগী মুকুলী রানী বলেন, “৬৩ লাখ টাকা ওঠানো হলেও আমাকে দেওয়া হয়েছে মাত্র ৩ লাখ। পরে আরও কয়েক লাখ টাকার বিল তুলে এক লাখ টাকা দিয়েছে। আমরা গরিব মানুষগুলো এখন বিপদে পড়ে গেছি।”
প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ আত্মসাৎ
শিবচরের মাদবরচরের চর এলাকায় পদ্মা সেতুর রেললাইন প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত হারুন বেপারি পরিবার অভিযোগ করেন, তাদের নামে বরাদ্দকৃত ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে তুলে নেওয়া হয়েছে।
হারুন বেপারি বলেন, “আমাদের সব কাগজ ঠিক ছিল। কিন্তু অফিসের কর্মকর্তাদের সহায়তায় নাসির কাজীর চক্র টাকা তুলে নেয়। নাসির ধরা পড়লে শত শত কোটি টাকা উদ্ধার সম্ভব।”
‘জিরো থেকে হিরো’ হওয়ার গল্প
নাসির কাজীর সাবেক স্ত্রীর বড় বোন জানান, একসময় নাসিরের কাছে ১০ টাকা ভাড়াও ছিল না। এখন তিনি প্লেনে ঘুরে বেড়ান, বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন এবং ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে একাধিক ফ্ল্যাট ও বাড়ির মালিক।
তিনি বলেন, “বিয়ের বার্ষিকীতে ১৪-১৫ লাখ টাকা খরচ করেছে। সন্তান জন্মের পর সোনার চামচ-বাটি দিয়েছে। এমন কাণ্ড বিশ্বাস করা কঠিন।”
তদন্তে কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত
জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সহায়তায় এসব দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইতোমধ্যে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ায় দুই কর্মচারীকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। তহশিলদারসহ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ পর্যায়ে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ঝোটন চন্দ্র চন্দ বলেন, “দালালদের তালিকা দুদকে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত চলছে।”
প্রশাসনের কঠোর অবস্থান
স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক জানান, দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাদারীপুরের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, “রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটকারীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তারা যত প্রভাবশালীই হোক, ছাড় দেওয়া হবে না।”
পলাতক নাসির কাজী
জানা গেছে, বাচামারা গ্রামের বাসিন্দা নাসির কাজী কয়েক বছর ধরে পলাতক রয়েছেন। জেলা প্রশাসনের তালিকাভুক্ত ২০ দালালের মধ্যে তিনি অন্যতম প্রধান।
স্থানীয়দের দাবি, নাসির ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তার করা গেলে ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত শত শত কোটি টাকা উদ্ধার সম্ভব।