বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে ঘিরে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। টিকিটের মূল্য, যাত্রীসেবা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে রাষ্ট্রীয় এই সংস্থাকে ঘিরে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিমানের ভেতরে দুর্নীতির ধরনও বদলেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। অনিয়ম-দুর্নীতি ঠেকাতে প্রশাসন ও মানবসম্পদ পরিদপ্তরের তদন্ত শাখা সক্রিয় থাকলেও এবার নতুন বিতর্কে জড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সাম্প্রতিক সময়ে বিমান বাংলাদেশে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক ও পরকীয়ার অভিযোগ। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন জুনিয়র গ্রাউন্ড সার্ভিস অফিসার (জিজিএসও) ফিরোজ-উজ-জামান (পি-৩৬৫০৭) এবং গ্রাউন্ড সার্ভিস অ্যাসিস্ট্যান্ট জান্নাতুল জেনান (জি-৫৩০০৮)। এই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি একাধিক প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ফিরোজ-উজ-জামান ও জান্নাতুল জেনানের বিরুদ্ধে কর্মক্ষেত্রে অনৈতিক সম্পর্কে লিপ্ত হওয়া, অননুমোদিতভাবে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা, ইউনিফর্ম পরিধান না করা, সহকর্মীদের ওপর প্রভাব বিস্তার, ডিউটি রোস্টার ও হজ পোস্টিং প্রক্রিয়াকে বাণিজ্যিক রূপ দেওয়া এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মাধ্যমে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বিমানের প্রশাসন ও মানবসম্পদ পরিদপ্তরের তদন্ত শাখা এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর গত বছরের ২ নভেম্বর ফিরোজ-উজ-জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বিমানের পরিচালক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ) অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নওসাদ হোসেনের স্বাক্ষরিত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ফিরোজের কর্মকাণ্ড প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও নৈতিক মানদণ্ডের পরিপন্থী এবং বাংলাদেশ বিমান করপোরেশন কর্মচারী (চাকরি) প্রবিধানমালা ১৯৭৯-এর ৫৫ ধারার আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বরখাস্তকালীন সময়ে তাকে খোরপোষ ভাতা প্রদান এবং ঢাকায় প্রধান কার্যালয়ে নিয়মিত হাজিরা দিতে বলা হয়েছে।
এছাড়া ফিরোজ-উজ-জামানের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৮৪ লাখ টাকা অবৈধভাবে আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
এই অভিযোগগুলোর সূত্রপাত হয় জান্নাতুল জেনানের স্বামী সাহেদ মাহমুদ সজলের করা লিখিত অভিযোগ থেকে। তদন্তে উঠে আসে ফিরোজ ও জেনানের অনৈতিক সম্পর্ক, দাপ্তরিক কাজে অবহেলা এবং আর্থিক অনিয়মের নানা তথ্য। ১১ পৃষ্ঠার একটি ‘গোপনীয়’ তদন্ত প্রতিবেদনে ঘটনার সূত্রপাত, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং অভিযোগকারীর বক্তব্য বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ফিরোজ-উজ-জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও জান্নাতুল জেনানকে বদলি করা হয়েছে বিমান বাংলাদেশের যশোর কার্যালয়ে। এ ঘটনায় বিমানের প্রশাসন ও মানবসম্পদ পরিদপ্তরের তদন্ত শাখা গত ৪ জানুয়ারি পৃথক দুটি অভিযোগনামায় বিভাগীয় মামলা দায়ের করে। ফিরোজ-উজ-জামানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা নম্বর ৩৮৪৪০ এবং জান্নাতুল জেনানের বিরুদ্ধে মামলা নম্বর ৩৮৪৫।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ফিরোজ-উজ-জামানের বিরুদ্ধে জুনিয়র নারী কর্মীর কাছে হোয়াটসঅ্যাপে অশোভন বার্তা পাঠানো, কু-প্রস্তাব দেওয়া এবং টাকা ধার নিয়ে ফেরত না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এদিকে, এনপিবি নিউজের হাতে আসা একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর উত্তরায় একটি বাসার সামনে ফিরোজ-উজ-জামান ও জান্নাতুল জেনানের স্বামী সাহেদ মাহমুদ সজলের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই বাসায় জান্নাতুল জেনান ও তার মা বসবাস করতেন এবং সেখানে ফিরোজের নিয়মিত যাতায়াত ছিল।
তদন্ত প্রতিবেদনে জান্নাতুল জেনান ফিরোজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা স্বীকার করলেও ফিরোজ-উজ-জামান তার জবানবন্দিতে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
প্রতিবেদনটি নিয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাময়িক বরখাস্ত থাকা ফিরোজ-উজ-জামান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম জানান, তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষ হলে সরকারি বিধি অনুযায়ী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ফিরোজকে সাময়িক বরখাস্ত ও জান্নাতুল জেনানকে বদলি করা হয়েছে কেন, একই অভিযোগে দুই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অপরাধের মাত্রা ও সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত