২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অনুসন্ধান প্রায় শেষ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগের আড়ালে কুয়েত সোসাইটি ফর রিলিফ (কেএসআর) ও শারজাহ চ্যারিটি ইন্টারন্যাশনাল নামের দুটি ইসলামি এনজিওর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তিনি এক হাজার কোটি ৩৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে দুদক।
দুদক সূত্র জানায়, এনজিও দুটির বিদেশি অনুদানের অর্থ নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তরের মাধ্যমে আত্মসাৎ ও মানি লন্ডারিং করা হয়েছে।
পরিবারের সদস্যদের নামে অর্থ স্থানান্তর
অনুসন্ধানে মনিরুল ইসলামের স্ত্রী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব সায়লা ফারজানা, শ্যালক রেজাউল আলম শাহীন ও শ্যালিকার ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। দুদকের দাবি, নিজের নামে হিসাব না খুলে স্ত্রী ও নিকটাত্মীয়দের নামে একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অবৈধ অর্থ বৈধ করার চেষ্টা করেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক এই দুটি এনজিও রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা ও পুনর্বাসনের নামে বিপুল অঙ্কের অনুদান সংগ্রহ করলেও সেই অর্থ কৌশলে মনিরুল তার শ্যালক রেজাউল আলম শাহীনের মালিকানাধীন এস এস এন্টারপ্রাইজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তর করেন।
ব্যাংক নথিতে ভয়াবহ চিত্র
দুদকের নথি অনুযায়ী, কুয়েত সোসাইটি ফর রিলিফের নামে ২০২০ সালের ১৬ অক্টোবর কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের উত্তরা শানায়া শাখায় একটি হিসাব খোলা হয়। ওই হিসাবে ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৮৬৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা জমা এবং ৮৬৭ কোটি ৯ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমানে হিসাবে রয়েছে মাত্র ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
এই হিসাব থেকে ড্রিম স্ট্রাকচার, এস এস এন্টারপ্রাইজ, গোলাম রব্বানী অ্যাড কন্ট্রাক্টর, সাজা ট্রেডিং, সানি এন্টারপ্রাইজ, রেক্সন ট্রেডিং করপোরেশন ও ডিডি বিল্ডার্সের হিসাবে বারবার অর্থ পাঠানোর প্রমাণ মিলেছে।
২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কেএসআর ও শারজাহ চ্যারিটি ইন্টারন্যাশনাল থেকে এস এস এন্টারপ্রাইজের দুটি হিসাবে মোট ৩৯ কোটি টাকা জমা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
স্ত্রী ও শ্যালকের নামে ৩৫ ফ্ল্যাট
দুদক জানিয়েছে, মনিরুলের স্ত্রী সায়লা ফারজানা ও শ্যালকের নামে রাজধানীতে ৩৫টি ফ্ল্যাটের সন্ধান মিলেছে। সায়লার নামে ২০২০ সালে কমিউনিটি ব্যাংক পিএলসিতে ১১ কোটি ২০ লাখ টাকা জমা এবং প্রায় সমপরিমাণ অর্থ উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে।
এছাড়া তার নামে তিনটি ডিপিএস ও দুটি এফডিআরের তথ্যও সংগ্রহ করেছে দুদক।
মনিরুলের শ্যালক রেজাউল আলম শাহীনের নামে কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকে মোট ১১টি হিসাব পরিচালনার তথ্য মিলেছে। এসব হিসাবে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ২৮৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা জমা ও ২৮৫ কোটি ৮ লাখ টাকা উত্তোলনের প্রমাণ রয়েছে।
জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এসবির প্রধান হওয়ার পর মনিরুল ইসলাম এনজিও দুটির বিরুদ্ধে জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগ তুলে নিয়ন্ত্রণ নেন। তিনি প্রতিষ্ঠান দুটির কর্মকর্তাদের জঙ্গি আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তারের হুমকি দেন। তবে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে এসব অভিযোগের কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি।
দুদকের বক্তব্য-
এ বিষয়ে দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) আক্তার হোসেন বলেন,
“মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। অনুসন্ধান শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ব্যাংক ও আর্থিক নথিপত্র সংগ্রহ শেষ হয়েছে। শিগগিরই অনুসন্ধান প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে।
ভারতে পলাতক মনিরুল-
সূত্র জানায়, জুলাই বিপ্লবের পর মনিরুল ইসলাম স্ত্রীসহ দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। বর্তমানে তিনি ত্রিপুরা রাজ্যের একটি এলাকায় বসবাস করছেন। তার মেয়ে লন্ডনে অধ্যয়নরত বলে জানা গেছে। ভারতে অবস্থান করেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি দেশের সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত মন্তব্য করছেন।