ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ–৩ দীর্ঘদিন ধরেই ঘুষ বাণিজ্যের ‘হটস্পট’ হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। সম্প্রতি ১০ লাখ টাকার ঘুষ লেনদেনের একটি ভিডিও প্রকাশ পাওয়ার পর, প্রধান প্রকৌশলীকে ম্যানেজ করে পদ আঁকড়ে থাকার অভিযোগ উঠেছে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাইনুল ইসলামের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগ ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সর্বশেষ বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ১০ কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে দিতে মোটা অংকের কমিশন গ্রহণ করেছেন মাইনুল ইসলাম। অভিযোগে বলা হয়, ঠিকাদারদের ত্রুটিপূর্ণ ও জাল কাগজপত্র যাচাই-বাছাই না করেই তিনি সেগুলো প্রধান প্রকৌশলীর কাছে সুপারিশ করেছেন।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে “দেশের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশ পুলিশের থানা প্রশাসনিক কাম ব্যারাক ভবন নির্মাণ” প্রকল্প। এর আওতায় দক্ষিণ ও উত্তর কেরানীগঞ্জ থানার নতুন ভবন নির্মাণের দুটি দরপত্রে গুরুতর অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার নতুন ভবন নির্মাণের জন্য ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ–৩ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাইনুল ইসলাম ১১/৬/২০২৪ তারিখে দরপত্র আহ্বান করেন। এতে ৮ জন ঠিকাদার অংশগ্রহণ করেন। প্রাথমিক মূল্যায়নের পর ৫ জনকে রেসপনসিভ দরদাতা হিসেবে নির্বাচন করা হয়। পরে এমকেডি ও বিজি (জেভি) নামের একটি জয়েন্ট ভেঞ্চারকে বিজয়ী ঘোষণা করে মাইনুল ইসলাম তার সুপারিশ প্রধান প্রকৌশলীর কাছে পাঠান।
তবে প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেদুজ্জামান চৌধুরী নথিপত্র পর্যালোচনা করে জয়েন্ট ভেঞ্চারের কাগজপত্রে ত্রুটি দেখতে পান এবং তা ফেরত পাঠান। পরবর্তীতে ২৬.০৬.২০২৪ তারিখে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী উন্নয়ন, ঢাকা ডিভিশন ওই সুপারিশ গ্রহণ না করে পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ দেন।
একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে উত্তর কেরানীগঞ্জ থানার নতুন ভবন নির্মাণ প্রকল্পেও। এ প্রকল্পের জন্য ১১৬৩০৫১ নম্বর দরপত্র আহ্বান করা হয়, যেখানে ৯ জন ঠিকাদার অংশ নেন। প্রাথমিক যাচাইয়ে ৮ জনকে রেসপনসিভ ঘোষণা করা হলেও আকামিন-কিডিসি (জেভি) কে বিজয়ী দেখিয়ে সুপারিশ পাঠানো হয়। এখানেও প্রধান প্রকৌশলী কাগজপত্রে ত্রুটি দেখতে পেয়ে নথি ফেরত দেন এবং পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
দুটি প্রকল্পের মোট কাজের মূল্য যথাক্রমে ১০ কোটি ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ১০ কোটি ১৩ লাখ ৩১ হাজার ৪৫০ দশমিক ৫০৪ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী মাইনুল ইসলাম ঠিকাদার এমকেডি ও বিজি (জেভি) এবং আলামিন-কিউসি (জেভি) এর কাছ থেকে মোটা অংকের কমিশন নিয়ে ত্রুটিপূর্ণ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও সেগুলো সুপারিশ করেছেন।
গণপূর্ত বিভাগের একাধিক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মাইনুল ইসলাম এতটাই প্রভাবশালী যে তার বিরুদ্ধে কথা বললে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জীবনযাত্রা অসহনীয় হয়ে ওঠে। তারা দাবি করেন, যেই প্রধান প্রকৌশলী দায়িত্বে থাকুন না কেন, তাকে ‘ম্যানেজ’ করে নিজের প্রভাব বজায় রাখেন মাইনুল ইসলাম। দুর্নীতির খবর প্রকাশ হলে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেদুজ্জামান চৌধুরী বলেন, “আজ ছুটির দিন। তাই এখন বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়। আপনার প্রশ্ন লিখিতভাবে দিলে আমি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে জানাবো।”
অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাইনুল ইসলামের মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।