বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একমাত্র মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছেন—এমন আলোচনা এখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তার মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিচ্ছবি স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর জিয়া পরিবারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন নানা আলোচনা চলছে, তখন জাইমা রহমানের ধারাবাহিক উপস্থিতি রাজনীতিতে তার পদার্পণের সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করেছে।
বাবার প্রতিনিধি হিসেবেই আলোচনায় জাইমা
বিভিন্ন সময়ে বাবা তারেক রহমানের প্রতিনিধি হয়ে আন্তর্জাতিক ও দলীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার মাধ্যমেই মূলত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন জাইমা রহমান।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ৭৩তম ‘ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্ট’ অনুষ্ঠানে তারেক রহমানের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন তিনি। ওই সফরে তিনি দক্ষিণ ক্যারোলিনার সাবেক গভর্নর ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির সাবেক নির্বাহী পরিচালক ডেভিড বিসলে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ডেস্ট্রো এবং উইমেনস ফেলোশিপ ফাউন্ডেশনের প্রধান রেবেকা ওয়াগনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল তার রাজনৈতিক উপস্থিতির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
ভার্চুয়াল সভা ও ইউরোপীয় বৈঠক
গত ২৩ নভেম্বর প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিয়ে বিএনপির মিডিয়া সেলের আয়োজিত একটি ভার্চুয়াল সভায় প্রথমবারের মতো বক্তব্য রাখেন জাইমা রহমান। ওই সভায় বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদসহ দলটির শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
৩৯ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়, যেখানে তাকে সংগঠিতভাবে দলের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে কথা বলতে দেখা যায়।
এ ছাড়া ইউরোপীয় প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে বিএনপির একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠকেও অংশ নেন তিনি।
খালেদা জিয়ার মৃত্যু ও রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতায় উপস্থিতি
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর জানাজা, দাফন এবং বিদেশি অতিথিদের সমবেদনা গ্রহণ—সব ক্ষেত্রেই বাবার পাশে সক্রিয়ভাবে উপস্থিত ছিলেন জাইমা রহমান।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাবিক, ভুটান, নেপাল, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার প্রতিনিধিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতেও অংশ নেন তিনি।
এসব দৃশ্য রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তাকে ধীরে ধীরে নেতৃত্বের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সামনে আনার একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া।
রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও বাস্তবতা
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে পারিবারিক উত্তরাধিকার নতুন নয়। বাংলাদেশে ‘শেখ পরিবার’ ও ‘জিয়া পরিবার’ দীর্ঘদিন ধরেই সেই বাস্তবতার উদাহরণ।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসা এবং পরবর্তী সময়ে তারেক রহমানের উত্থানের ধারাবাহিকতায় জাইমা রহমানের নাম আসা অনেকের কাছেই স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে।
শিক্ষাজীবন ও পেশাগত পরিচয়
২৬ অক্টোবর ১৯৯৫ সালে জন্ম নেওয়া জাইমা রহমান ঢাকার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। ২০০৮ সালে বাবা-মায়ের সঙ্গে লন্ডনে পাড়ি জমান। সেখানে কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
২০১৯ সালে লন্ডনের ঐতিহাসিক লিংকনস ইন থেকে ‘বার অ্যাট ল’ ডিগ্রি লাভ করে পেশাদার আইনজীবী হিসেবে স্বীকৃতি পান তিনি।
বাবাকে সহযোগিতার অঙ্গীকার
গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে জাইমা রহমান লেখেন,
“ইনশাআল্লাহ, দেশে ফিরে দাদির পাশে থাকতে চাই। এই সময়টাতে আব্বুকে সর্বাত্মক সহায়তা করতে চাই। একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে দেশের জন্য সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে চাই।”
পোস্টে উঠে আসে তার শৈশব, প্রবাসজীবন এবং দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা।
সামনে কী?
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জাইমা রহমান তার বাবার পাশে থেকেই সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন।
সব মিলিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত—দীর্ঘদিন নীরবে থাকা জাইমা রহমানের সাম্প্রতিক উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, খুব শিগগিরই দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।