নেত্রকোণা প্রতিনিধি-
নেত্রকোণার মোহনগঞ্জে সরকারি সিস্টেম ব্যবহার করে ভুয়া জন্মনিবন্ধন তৈরির মাধ্যমে কোটিপতি বনে যাওয়ার অভিযোগে মওদুদ আহমেদ শাওন (৩৫) নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের নকল সিল-স্বাক্ষর ব্যবহার করে অন্তত ১৩ জন রোহিঙ্গা নাগরিকের জন্মনিবন্ধন তৈরি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
গ্রেপ্তার শাওন মোহনগঞ্জ পৌরশহরের টেংগাপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তার স্ত্রী ঝর্ণা আক্তার উপজেলার ৭ নম্বর গাগলাজুর ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোক্তা। অভিযোগ রয়েছে, স্ত্রীকে আড়াল করে ইউনিয়নের জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন সরকারি অনলাইন কার্যক্রম এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন শাওন।
ইউএনও কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার
পুলিশ ও স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, চার-পাঁচ বছর আগে মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে টেকনিশিয়ান পদে চাকরির জন্য আবেদন করেন শাওন। চাকরি না পেলেও কৌশলে ইউএনও কার্যালয়ের অনলাইন কাজকর্মে জড়িয়ে পড়েন তিনি। একপর্যায়ে জন্ম-মৃত্যুনিবন্ধন, টিসিবি কার্ড যাচাইসহ বিভিন্ন সরকারি ওয়েবসাইটের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন।
অভিযোগ রয়েছে, ইউএনও কার্যালয়ে কাজের প্রভাব খাটিয়ে উপজেলার আটটি ইউনিয়নের জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন শাওন। চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের সিল-স্বাক্ষর নকল করে শুরু করেন অবৈধ জন্মনিবন্ধনের বাণিজ্য।
কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শাওনের ঘনিষ্ঠ একাধিক ব্যক্তি জানান, ইউএনও কার্যালয়ের সব আইসিটি প্রোগ্রামের দায়িত্ব কার্যত শাওনের হাতেই ছিল। সবাই তাকে ‘ইউএনও কার্যালয়ের আইসিটি প্রোগ্রামার’ বলেই জানত। এই সুযোগে ভুয়া জন্মনিবন্ধন তৈরি করে তিনি লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অবৈধ আয় দিয়ে শাওন ইতোমধ্যে প্রায় ৪০ লাখ টাকা মূল্যের একাধিক হারভেস্টার মেশিন কিনেছেন। এছাড়া ময়মনসিংহ শহরে জমি কেনার তথ্যও পেয়েছে প্রশাসন।
মামলা ও গ্রেপ্তার
সম্প্রতি গাগলাজুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব রাজিব মিয়া প্রতারণার অভিযোগে শাওনের বিরুদ্ধে মোহনগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন। এর পর ২৪ ডিসেম্বর দুপুরে মোহনগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সামনে একটি দোকান থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহনগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জয় পাল জানান, সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে ২৫ ডিসেম্বর শাওনকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
রোহিঙ্গা নাগরিকদের জন্মনিবন্ধনের অভিযোগ
মোহনগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাফিজুল ইসলাম হারুন বলেন, “চেয়ারম্যান-মেম্বারের ভুয়া সিল-স্বাক্ষর ব্যবহার করে অন্য জেলার ১৩ জন নাগরিকের জন্মনিবন্ধন তৈরি করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তারা রোহিঙ্গা নাগরিক।”
তিনি আরও বলেন, শাওন দাবি করেছেন তার ব্যবহৃত ওয়েবসাইটের পাসওয়ার্ড হ্যাক হয়েছিল। তবে প্রাথমিক তদন্তে এ দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। তদন্তে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
প্রশাসনের বক্তব্য
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা খাতুন বলেন, “আমি দায়িত্ব নেওয়ার পরই সব পাসওয়ার্ড তার কাছ থেকে নিয়ে নিই। বাইরের জেলার লোকজনের জন্মনিবন্ধনের বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গেই অভিযান চালানো হয়। বিস্তারিত পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে আসবে।”
জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন, “বিষয়টি জানার পর ইউএনওকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলার কোথাও যেন এ ধরনের অনিয়ম না ঘটে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নজরদারি অব্যাহত থাকবে।”