কালিয়াকৈরের সাবেক মেয়র মজিবুর রহমানের দুর্নীতির সাম্রাজ্য
স্টাফ রিপোর্টার | কালিয়াকৈর (গাজীপুর)
গ্রামের মানুষ যাকে চেনেন দরিদ্র কৃষক শুক্কুর আলীর ছেলে ‘মজি’ নামে, সেই মজিবুর রহমান আজ হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক। শিক্ষা সনদে নাম মজিবুর রহমান। তিনি কালিয়াকৈর পৌরসভার সাবেক মেয়র এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। শেখ হাসিনার টানা তিন আমলেই তিনি ছিলেন পৌর মেয়রের দায়িত্বে—যে সময়ে বিএনপির অসংখ্য নেতা-কর্মী ছিলেন কারাগারে, গুম-খুন ও নির্যাতনের শিকার।
স্থানীয়দের ভাষায়, তখনও বিএনপি নামধারী মজিবুর ছিলেন ‘রাজার হালে’।
আওয়ামী ছায়ায় বিএনপি নেতা
মজিবুর রহমানের উত্থানের নেপথ্যে ছিলেন ১৯৭১ সালের ধর্ষণ মামলার আসামি ও সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। দু’জনের মধ্যে ছিল গভীর দহরম-মহরম সম্পর্ক। রাত-বিরাতে মজিবুর যেতেন মোজাম্মেল হকের বাসভবন ও খাসকামরায়। এ কারণে স্থানীয় বিএনপি নেতারা ঠাট্টা করে তাকে ডাকতেন ‘মোজাম্মেল পুত্র’ নামে।
মোজাম্মেল হকের ছত্রছায়ায় কালিয়াকৈরের টেন্ডার বাণিজ্য, ঝুট ব্যবসা, ভুয়া উন্নয়ন প্রকল্প, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, জনবল নিয়োগে অনিয়ম, এমনকি সরকারি বনের জমি দখল করে শিল্পকারখানায় বিক্রির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ভয়ই ছিল ক্ষমতার হাতিয়ার
কালিয়াকৈরে বিএনপি ও সাধারণ মানুষের কাছে মজিবুর এখনো এক মূর্তিমান আতঙ্ক। আওয়ামী লীগ আমলে তিনি থানার ওসির কাছে বিএনপি নেতাদের নামের তালিকা পাঠাতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কেউ তার বিরোধিতা করলেই নেমে আসত নির্যাতন।
এক সাবেক পৌর কর্মকর্তা তার নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে থানায় জিডিও করেছিলেন। তবে ‘মজি বাহিনী’র ভয়ে আজও কেউ প্রকাশ্যে তার বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পান না। স্থানীয়দের ভাষায়—আগে তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের আস্থাভাজন, এখন বিএনপির নেতা।
মাটির ঘর থেকে বহুতল সাম্রাজ্য
মজিবুর রহমানের পিতা শুক্কুর আলী ছিলেন দরিদ্র কৃষক। মাটির ঘরে বসবাস করতেন। লেখাপড়া শেষে মজিবুর পরিবহন ও পোল্ট্রি ব্যবসায় যুক্ত হলেও ব্যর্থ হন। ২০ লাখ টাকার ব্যাংক ঋণ সুদে-আসলে দাঁড়ায় ৪৪ লাখ টাকায়। খেলাপি হয়ে জমিসহ খামার বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে পড়েন।
২০০১ সালে বিএনপির প্রভাবশালী নেতা চৌধুরী তানভীর ছিদ্দিকীর সান্নিধ্যে এসে ভাগ্য ঘুরে যায় তার। ২০০৪ সালে কালিয়াকৈর পৌরসভার প্রশাসক নিযুক্ত হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় অবিশ্বাস্য উত্থান।
পৌরসভার টাকা, ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট
অভিযোগ রয়েছে—পৌরসভার উন্নয়ন প্রকল্প নিজের ঠিকাদার দিয়ে করিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন মজিবুর। পৌরসভার অর্থে জমি কিনে প্লট করে বিক্রির টাকা জমা হতো তার ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে।
নির্বাচন বন্ধ রাখতে সীমানা জটিলতার অজুহাতে মামলা করে বছরের পর বছর পৌরসভা নিয়ন্ত্রণে রাখেন তিনি।
সম্পদের পাহাড়: বাংলাদেশ থেকে বিদেশে
অনুসন্ধানে দেশে অন্তত ৮টি বহুতল ভবনের তথ্য মিলেছে—সর্বোচ্চ ১১ তলা পর্যন্ত। এর মধ্যে রয়েছে:
পিরেরটেকিতে দৃষ্টিনন্দন ডুপ্লেক্স বাড়ি
সফিপুর বাজারে ৯ তলা ভবন
চান্দরা এলাকায় একাধিক ৫ ও ৭ তলা ভবন
লতিফপুরে থানার পাশে ১১ তলা এস.টি টাওয়ার (মূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা)
কালিয়াকৈর বাজারে ৫ তলা সোনালী ব্যাংক ভবন
মহাখালী ডিওএইচএসে ৩২০০ স্কয়ার ফিটের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট
এছাড়াও স্ত্রী আজমেরি বেগম মুন্নি, শ্যালিকা, আত্মীয় ও অনুসারীদের নামে শত শত বিঘা জমি রয়েছে। ছেলে কানাডায়, মেয়ে আমেরিকায় থাকেন—সেখানেও বাড়ি কেনার অভিযোগ রয়েছে।
জাতীয় সংসদের দিকে চোখ
স্থানীয়দের দাবি, বিএনপির মনোনয়ন পেতে প্রয়োজনে ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় করতেও প্রস্তুত মজিবুর। দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ, উপহার-খরচ বহনের অভিযোগও রয়েছে।
দুদকের তলব, কিন্তু নীরব প্রশাসন
অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদক মজিবুর রহমানকে তলব করেছিল। ৫ জানুয়ারি তাকে সেগুনবাগিচায় হাজির হতে বলা হয়। তবে দুদক সূত্রে জানা গেছে, তিনি হাজির হয়ে দায়মুক্তির চেষ্টা করেন। তদন্ত কর্মকর্তা এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান।
উপসংহার
দরিদ্র কৃষকপুত্র থেকে হাজার কোটি টাকার মালিক হওয়া মজিবুর রহমান কালিয়াকৈরের রাজনীতিতে এক ভয়ংকর প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। বিএনপির পতাকা হাতে নিয়ে আওয়ামী প্রভাবের আশ্রয়ে গড়ে তুলেছেন দুর্নীতির এক অদম্য সাম্রাজ্য। দুদকের তলব এলেও মাঠে বাস্তবতা বদলায়নি।
কালিয়াকৈরের মানুষের কাছে এখনো একটাই পরিচয়—
“মজিবুর মানেই ভয়।”