অল্প সময়ে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ, দুদকের তলবের পরও অগ্রগতি নেই
নিজস্ব প্রতিবেদক-
24/7Bangla News
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) দীর্ঘদিন ধরেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ, দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে আলোচিত ও সমালোচিত। সংস্থাটির বিভিন্ন কার্যক্রম ও উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি যেন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি—উভয় পর্যায়েই ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, যেখানে রাজউকের একাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় আঁতাতের অভিযোগ উঠছে।
এই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই সম্প্রতি আলোচনায় এসেছেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) জোন–৬ এর ইমারত পরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান।
ছাত্ররাজনীতি থেকে রাজউকের চাকরি
ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ডিপ্লোমা ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং অধ্যয়নের সময় মনিরুজ্জামান জহির রায়হান হলে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী নেতাদের সুপারিশে তিনি ২ জুলাই ২০১৮ সালে রাজউকের প্রধান কার্যালয়ে ইমারত পরিদর্শক হিসেবে যোগদান করেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি নিজেকে বিএনপির নেতা হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
দুদকের অভিযোগ ও তলব
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ দাখিল হওয়া এক অভিযোগে বলা হয়েছে, মনিরুজ্জামান মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মালিক হয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী—
ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট
গাজীপুরে একাধিক প্লট
বরিশাল সদর ও বাউফলের ছিটকায় জমি ও ভবন
ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল
ব্যাংকে কোটি টাকার এফডিআর
এসব সম্পদের কোনো বৈধ আয়ের উৎস নেই বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ২ অক্টোবর দুদক মনিরুজ্জামান ও তার স্ত্রী কানিজ জাহানকে তলব করে। তাদের এবং নির্ভরশীলদের নামে অর্জিত স্থাবর–অস্থাবর সম্পদ, আয়ের উৎস ও দায়-দেনার পূর্ণ বিবরণী ২১ কার্যদিবসের মধ্যে দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে এরপর দুদকের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাটের মালিকানা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গ্রামের বাড়ির বাসভবনটি ভঙ্গুর অবস্থায় থাকলেও রাজধানীর বাংলামটরে সারিনা আশরাফ নিবাসের ৯/সি নম্বর ফ্ল্যাটের মালিক মনিরুজ্জামান, যেখানে তিনি বর্তমানে বসবাস করছেন।
এছাড়া—
মহাখালীর ফ্যালকন গার্ডেনে একটি ফ্ল্যাট
উত্তরার উলুদাহা, বাউনিয়া মৌজায় পলিয়েন্থাস ভবনে একটি ফ্ল্যাট
দক্ষিণ পীরেরবাগের আমতলা টাওয়ারে ১,৬৩০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট
ফ্যালকন গার্ডেনের সিকিউরিটি গার্ড আব্দুস সবুর এনবিবিকে জানান, ফ্ল্যাটটি একসময় ১ কোটি ১০ লাখ টাকায় বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
গাজীপুর ও বরিশালে বিপুল সম্পদ
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের বাউপাড়া মৌজায় বন বিভাগের জমি দখল করে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে ভূমি দস্যুদের বিরুদ্ধে। সেই জমির একটি অংশ চারজনের সঙ্গে শেয়ারে কিনেছেন মনিরুজ্জামান—এমন তথ্য মিলেছে। সরেজমিনে গিয়ে সেখানে তার নামসংবলিত মালিকানা সাইনবোর্ডও দেখা গেছে।
এছাড়া—
টঙ্গীর সাতাইশ এলাকায় টিনশেড বাড়ি (৯টি রুম, ভাড়া দেওয়া)
বরিশালের চাঁদমারি, বান্দ রোডে ১০ শতাংশ জমিতে তিন ইউনিট টিনশেড ঘর
বরিশালের কাশিমপুর এলাকায় পাঁচতলা ভবন
বাউফলের ছিটকা রণভৈরবে তিনতলা বাড়ি ও ৯৬০ শতাংশ জমি
স্থানীয়দের দাবি, এসব জমি ও ঘর থেকে নিয়মিত ভাড়া আদায় করা হয়।
মাছের ঘের ও জমি নিয়ে স্থানীয়দের নীরবতা
বাউফলের ছিটকা রণভৈরবে অনুসন্ধানে স্থানীয়রা জানান, মনিরুজ্জামানের একাধিক মাছের ঘের ও বিভিন্ন স্থানে জমি রয়েছে। তবে সাংবাদিক পরিচয় বুঝতে পারার পর অনেকেই কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান, যা এলাকায় এক ধরনের ভয়ের পরিবেশের ইঙ্গিত দেয়।
বিলাসবহুল জীবনযাপন
ব্যক্তিগত চলাচলের জন্য মনিরুজ্জামান ব্যবহার করেন—
ইয়ামাহা FZS ভার্সন–২ মোটরসাইকেল
২০১৭ মডেলের টয়োটা প্রিমিও প্রাইভেট কার
প্রতি শনিবার স্ত্রী কানিজ জাহান ও সন্তানকে নিয়ে ব্রিটিশ কাউন্সিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যাতায়াত করেন বলেও জানা গেছে।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য
মনিরুজ্জামানের নামে এমকে ডিজাইন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালটেন্স লিমিটেড নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটি তার স্ত্রী কানিজ জাহানের নামে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন অঞ্চল–৫ থেকে নিবন্ধিত। ইসলামী ব্যাংকে প্রতিষ্ঠানটির হিসাব রয়েছে। একই নামে গাজীপুরের টঙ্গীর সাতাইশ এলাকায় আরেকটি অফিসও রয়েছে।
মন্তব্য করতে রাজি নন
এ বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও ইমারত পরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
প্রশ্ন উঠছে—এত বিপুল সম্পদের উৎস কী? দুদকের তলবের পরও তদন্তের অগ্রগতি কেন দৃশ্যমান নয়? রাজউকের দুর্নীতির অভিযোগ কি আদৌ জবাবদিহির আওতায় আসবে?