-সাভারের সিরিয়াল কিলারের ভয়ংকর স্বীকারোক্তি
সাভারে সংঘটিত ধারাবাহিক ছয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া ভবঘুরে মশিউর রহমান সম্রাট (ছদ্মনাম) পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বিকৃত ও ভয়ংকর মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি স্বীকার করেছেন, কোনো পাগল বা ভবঘুরেকে অনৈতিক যৌনাচারে লিপ্ত অবস্থায় দেখলেই তিনি তাদের হত্যা করতেন। এই হত্যাকাণ্ডকে তিনি নিজের ভাষায় ‘থার্টি ফোর’ বা ‘সানডে–মানডে ক্লোজ’ বলে উল্লেখ করতেন।
সাভার থানার পরিদর্শক (অপারেশন) হেলাল উদ্দিন জানান, সম্রাট কোনো মানসিক রোগী নন। তবে দীর্ঘদিনের মাদকাসক্তির কারণে তিনি গুরুতর মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন।
তিনি বলেন, “তার কাছে মানুষ হত্যা একপ্রকার নেশায় পরিণত হয়েছিল। খুনকে সে স্বাভাবিক কাজ হিসেবেই দেখত।”
পুলিশ জানায়, মশিউর রহমান সম্রাট তার প্রকৃত নাম নয়। পরিচয় গোপন রাখতে তিনি ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। তার স্থায়ী ঠিকানাও সাভারে নয়। ধারণা করা হচ্ছে, অন্য এলাকায় অপরাধ করার পর আত্মগোপনে সাভারে এসে তিনি ভবঘুরে জীবন বেছে নেন। তার প্রকৃত পরিচয় শনাক্তে কাজ চলছে।
তদন্তে জানা গেছে, সাভারে অবস্থানকালে তিনি অধিকাংশ রাত কাটাতেন বাসস্ট্যান্ড এলাকার মডেল মসজিদে। ২০২৫ সালের ৪ জুলাই আসমা বেগম নামে এক বৃদ্ধাকে হত্যার পর তিনি সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারের একটি পরিত্যক্ত ভবনে আশ্রয় নেন এবং সেখানেই নিজের আস্তানা গড়ে তোলেন। পরবর্তী পাঁচ মাসে ওই ভবন থেকে একে একে পাঁচটি লাশ উদ্ধার হয়, যা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। এরপর থেকেই ভবনটি পুলিশি নজরদারিতে ছিল।
পরিদর্শক হেলাল উদ্দিন আরও জানান, নজরদারির অংশ হিসেবে গত শুক্রবার রাতে কমিউনিটি সেন্টার পরিদর্শনে গিয়ে পুলিশ সম্রাটের বিছানায় এক কিশোরীকে শুয়ে থাকতে দেখে। জিজ্ঞাসাবাদে কিশোরী নিজেকে তার বোন বলে পরিচয় দেয়। কিন্তু পরদিন শনিবার রাতে ওই কিশোরীসহ আরও একজনকে হত্যা করে তাদের মরদেহ পুড়িয়ে দেন সম্রাট। রোববার দুপুরে পোড়া দুটি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
পরবর্তীতে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডে সম্রাটের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা হয়। রোববার সন্ধ্যায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সোমবার আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি ছয়টি হত্যার দায় স্বীকার করেন।
পুলিশ জানায়, দিনের বেলায় সম্রাটকে থানার আশপাশে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেলেও গভীর রাতে তাকে ঢাকা–আরিচা মহাসড়ক ও বিভিন্ন পদচারী সেতুর আশপাশে অবস্থান করতে দেখা যেত। সেখানে থাকা ভবঘুরে নারী ও পুরুষদের প্রলোভনে ফেলে তিনি কমিউনিটি সেন্টারে নিয়ে আসতেন। যারা সেখানে যেতেন, তারাই পরবর্তীতে হত্যার শিকার হতেন।
সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরমান আলী বলেন, “খুনি গ্রেপ্তার হয়েছে এবং হত্যার কথা স্বীকার করেছে। এখন নিহতদের পরিচয় শনাক্তে কাজ চলছে। শুধু এই ছয়টি নয়, তার সঙ্গে আরও কোনো অপরাধ জড়িত আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
পুলিশের ধারণা, এই সিরিয়াল কিলারের অপরাধের পরিধি আরও বিস্তৃত হতে পারে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত কিছু বলা যাচ্ছে না।